“আঙ্গো বাড়ি নোয়াখালী রয়াল ডিস্টিক ভাই”

Suborno provaat - Shuborno Provaat - সুবর্ণ প্রভাত
              ॥ অধ্যাপক মো. হাশেম ॥

আঙ্গো বাড়ি নোয়াখালী
রয়াল ডিস্টিক ভাই
হেনী-মাইজদী-চৌমুনীর
নাম কে হুনে নাই ॥

টিকট কাডি মানষ যেদিন
চাঁদে যাইবো ভাই
চাঁদের মা বুড়িরে দেইকলে
থাইকবো যে ব্যাটকাই
দমকার বুড়ি নোয়াখাইল্যা
কতা কইবো মিটমিডাই ॥

উলি-কুলি-কোদালি আর
রেইল বাড়িতে
চৈদ্দ আনা নোয়াখাইল্যা
চামড়ার টেনারীতে
জজ-বারিস্টর, উকিল-ডাক্তর
কোন ডিপাটে আমরা নাই ॥

কাতার-ডুবাই-আবুধাবি
মিডেলিস্টে গেলে
শতে শতে নোয়াখাইল্যা
হঁতে-ঘাঁডে মিলে
দেশ-বিদেশে জগৎ জোড়া
নোয়াখাইল্যার রাজতাই ॥

আমরা বালার-বালা একছার বালা
দুষ্ট লোকের যম
মোল্লা-মুন্সি, আলীম-জালীম
কোনটা আঙ্গো কম
বালা-বুরা হগল কামে
এক্কেবারে আগে থাই ॥

উল্লেখিত গানে নোয়াখালী জেলাকে জেলার রাজা বলে অন্য জেলার মানুষের প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে যে সম্বোধন করে আসছে। সে প্রেক্ষিতে আমি উক্ত গানের গীতিকার, সুরকার ও কণ্ঠশিল্পী হিসাবে উক্ত সম্বোধনের পক্ষে এ জেলাবাসীর পক্ষ থেকে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছি সাংকেতিক ভাষায়। স্পষ্ট করে বলতে গেলে ‘রয়্যাল ডিস্ট্রিক্ট’ নামটি আমরা ধারণ করিনি। তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের ১৭টি জেলার মধ্যে এ জেলাকে ভিন জেলার লোকই উক্ত অভিধায় ভূষিত করেছেন তাদের বিচার-বিশ্লেষণ দ্বারা। তাদের সূক্ষাতিসূক্ষ বিচার-বিশ্লেষণে ধরা পড়েছে উপকূলীয় এ জেলার ইতিহাস, ভূগোল, সমাজ-ধর্মবোধ, জীবন সংগ্রাম, আচার-আচরণ, ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং আরো বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যাবলী। যুগ যুগ বা শতাব্দীব্যাপী তাদের অনুভবের মাধ্যমে যা প্রত্যক্ষ করেছেন তারই ফলশ্রুতিতে জেলা হয়েছে ‘রয়্যাল ডিস্ট্রিক্ট’।
বিগত শতাব্দীর মধ্যাহ্নে আমরা প্রাথমিক বিদ্যালয় সমাপ্ত করে যখন উচ্চ বিদ্যালয় বা মহাবিদ্যালয়ে পড়তে নিজ এলাকা ছেড়ে ভিন জেলায় ভর্তির পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাই, তখন আমার সহপাঠী, শিক্ষক ও বন্ধু-বান্ধব দ্বারা রয়্যাল ডিস্ট্রিক্ট নামে সম্বোধিত হই। তখন বিশেষভাবে আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে এ সম্বোধন সম্পর্কে। এমন কতগুলো বিশেষ বৈশিষ্ট্য এ জেলার যা কি অন্য জেলা থেকে স্বতন্ত্র এবং যা এ জেলাকে রয়্যাল করতে সহায়তা করেছে।

দরইয়ার হাড়ের মানষ আমরা
জীবন বাজী ধরি
মহা বিপদ সংকেতেরে
অবহেলা করি
সাগরে যাই ইলিশ ধইত্তাম
দোয়া দুরুদ অড়ি ॥
আঙ্গো বাড়ি দরইয়ার হাড়ে
হাতিয়া-রামগতি
আঙ্গোরেতো বাঁচায় ধরিয়া
ঘটায় ও দুর্গতি
দরইয়ার লগে যুদ্ধ করি
বাঁচি আবার মরি ॥
হ্যাডের ভোকে আগুন জ্বইল্যে
কার কতা কে হুনে
মহা বিপদ সংকেত হুনি
যদিও নিজ কানে
বৌ-ঝিগোরে খাবাই আমরা
ঢেউয়ের লগে লড়ি ॥

উপরের গানে নদীভাঙন, বন্যা, ঝড়-ঝঞ্ঝা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, মহাপ্লাবন প্রভৃতি প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত করে এ জেলাকে সর্বকালে সর্বযুগে। তাছাড়া নদীভাঙন, বন্যা, মহাপ্লাবন প্রভৃতি প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত করে।

ইদ্দিরিতান মাইজদি শ’র
এতো লাগে বালা
যদিও নাই মাইজদি শ’র
হাঁচতালা-দশতালা
নিজের মাতো মহারানী যদিও হয় কালা
মা-জননী মহারানী যদিও হয় কালা ॥
লন্ডন গেলাম দিল্লী গেলাম
মাইজদির মতো নয়
মুরি-চিড়া-খই কি আর
ভাতের মতোন অয়,
মা’র মতোন কি ওইতো হারে
চাচী-জেডি-খালা ॥
নোয়াখালী হুরান শ’র
দরইয়ায় নিছে ভাঙ্গি
মাইজদি বানাইছে শ’র
হালা-কিলা টঙি
অফিস-আদালত বানাইয়াছে
গদা কাডের হালা ॥
হিয়ার হরে মাইজদি শ’র
নিতো চাইছে হেনী
এক গল্লিয়া মাইজদিরে লই
কত্তো টানা-টানি
ছোলাই-বোলাই নিতো চাইছে
আঙ্গো গলার মালা ॥

উপরের গানে ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক এ জেলা সদরের নাম ‘নোয়াখালী’ নয়। জেলা সদরটি মাইজদী নামে পরিচিত সর্বত্র।

“উড়ের হর্দার নোয়াখাইল্যা
কোন মিছিলে নাই
’৫২তে গুলি খাইছে
ঢাকা শহর যাই
নাম ওইছে সালাম
শহীদ ওইছে কইচ্ছে এককান
কামের মতো কাম
জীবন দিও রাইকছে হেদিন
নোয়াখাইল্যার নাম ॥

আগরতলা ষড়যন্ত্রের
মামলা তুলি নিলো
একে একে আসামীরা
খালাশ ওতো হাইলো
সার্জেন্ট জহুরুল হক মরি
তুঙ্গে নেয়, সংগ্রাম ॥

মিছিল-মিটিং ব্যারিকেডে
আঙ্গো জুড়ি নাই
স্বাধীন বাংলার ফ্ল্যাগ উড়ায়
আ.স.ম বর যাই
বীরশ্রেষ্ঠদের মধ্যে একজন
রুহুল আমিন নাম ॥

’৫২তে মনির চোদ্রি
কবর নাটক লেখলো
’৭১-এ মোফাজ্জল ও মনির
চৌদ্রি মইল্লো
জহীর রায়হান শহীদ উল্যা
কায়সাররে আরাইলাম ॥

মিটিং-মিছিল জমেনারে
নোয়াখাইল্যা বিদে
কামান-বন্দুক মানেনারে
টগবগ করে জিদে
মালেক উকিল-কমেরড তোহার
নামই তো সংগ্রাম
শহীদ অয় ন হেই কারণে
গাজী নাম দিলাম ॥

উপরের এ গানে নোয়াখালীর লোককে উড়ের হর্দার বলা হয়ে থাকে। উড়ের হর্দার মানে মিছিল, মিটিং, ব্যারিকেড, জ্বালাও-পোড়াও (বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে) ইত্যাদিতে লিডার বা নেতৃত্বে এ জেলার লোকই দক্ষ ও অভিজ্ঞ। তারই জীবনচিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

নোয়াখালীত্ চোদ্রি বেশী
ক’জনের নাম কমু
তাগো মধ্যে দুই-চারজনের
হরিচয় আইজ দিমু
বিসমিল্লাতে মনির চোদ্রির
নামটা আগে লমু ॥

দুই লম্বরে কবির চোদ্রি
মনির চোদ্রির ভাই
কবির চোদ্রি আইজো আছে
মুনির চোদ্রি নাই
মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ওইছে
আরনি তারে হামু ॥

ভি.সি মতিন চোদ্রি ভি.সি
মুজাফফরও চোদ্রি
ভিসি এ. কে. আজাদ আর
এফ. রহমান চোদ্রি
আর কইতান্নি দরকার ওইলে
মেলা ভিসি হামু ॥

তিনো ভাইয়ে চোদ্রি একজন
মোফাজ্জল হায়দার
বাংলা একাডেমীর সচিব
লুৎফুল হায়দার
এহতেশাম হায়দার চোদ্রির
নামটা এবার লমু ॥

বদরুল হায়দার চোদ্রি আবার
মোতাহের হোসেন চোদ্রি
হাবিব উল্যা বাহার আর
ইকবাল বাহার চোদ্রি
জোহুর হোসেন, কাইয়ুম চোদ্রির
নামটা এবার কমু ॥

উপরের গানে ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি-বাকরি, ধর্ম-কর্ম, জজ-ব্যারিস্টার, উকিল-ডাক্তার, অধ্যাপক-ভিসি, প্রকৌশলীসহ জীবনের প্রত্যেক স্তরে বিশিষ্টজনদের প্রাধান্য নোয়াখালীবাসীর। প্রত্যেক স্তরে না গিয়ে আমরা শুধু শিক্ষা ক্ষেত্রটাকে একটু দৃষ্টিপাত করেছি। কারণ যে জাতি বা দেশ বা অঞ্চল শিক্ষায় অগ্রগামী তারা অন্য সবক্ষেত্রে অগ্রগামী হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তার প্রমান ও সত্যতার প্রতি দৃষ্টিপাত করা হয়েছে।

ঘরে-ঘরে মালানা আর
ঘরে-ঘরে মৌলবী
নোয়াখালী জিলার এমনই খুবী
সুন্নতি লেবাস মাইনষের মাতায় টুবি ॥

এমন জিলা নোয়াখালী
শতকরা তো নব্বই জনের সুন্নতি দাঁড়ি
মক্তবে-মক্তবে হড়ায়
কোরান-কিতাব আরবী ॥

কোনাই আছে এত মাদ্রাসা
বড়-বড় হাফেজ-কারী
দেশ বাছা-বাছা
দেশ-বিদেশে ওয়াজ করে
ফিরিস্তার মতন ছবি ॥

আঙ্গোরে কয় ২য় আরব
আমরা বলে খাইছি আল্লা
নামের শরাব
দেইকতে-হুইনতে লাগে যেমন
রুসুলুল্লার সাহাবী ॥

এ গানে ইসলামী জ্ঞান-গরিমান ক্ষেত্রে এ জেলা মাওলানা-মৌলবী-হাফেজ-ক্বারী, ইমাম, মুয়াজ্জিন, মুফতি প্রভৃতি বিশিষ্ট ও বিদগ্ধ ব্যক্তিগণ যুগ যুগ ধরে এদেশের বিভিন্ন জেলার দুর্গম অঞ্চলে গিয়ে সেখানকার মানুষকে নামাজ, রোজা, সুরা-ক্বেরাত, মাসলা-মাসায়েল যে শিক্ষা দিয়েছেন তার প্রমান না চাইতেই পাওয়া যাবে অজস্র।

লেখক : প্রয়াত গীতিকার, সুরকার ও শিল্পী এবং নোয়াখালীর আঞ্চলিক গানের সম্রাট।

শেয়ার করুনঃ

142 thoughts on ““আঙ্গো বাড়ি নোয়াখালী রয়াল ডিস্টিক ভাই””

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

  • আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

    রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি
     
    ১০১১১২১৩
    ১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
    ২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
    ২৮২৯৩০