নোয়াখালীর আধ্যাত্মিক পীর হযরত হাফেজ খাজা মহিয়ুদ্দিন (র.)

Shuborno Provaat - সুবর্ণ প্রভাত

নিজস্ব প্রতিবেদন : নোয়াখালীর আলেম, ওলামা, পীর, বুজুর্গ ও কামেলদের মধ্যে হযরত হাফেজ খাজা মহিয়ুদ্দিন (র.) ছিলেন অন্যতম। তিনি একজন আধ্যাত্মিক পীরেকামেল ছিলেন। তাঁর জীবদ্দশায় তিনি বহু অলৌকিক ঘটনার নিদর্শন দেখিয়েছেন।
এ মহান আধ্যাত্মিক পীর হাফেজী পড়া অবস্থায় অলৌকিক ঘটনার সূত্রপাত ঘটে। ২০ বছর বয়সে তিনি কুরআন হেফজ্ করেন। হাফেজী পড়া শেষ করার পর তিনি মানুষের বাড়িতে গিয়ে খড়ের চিনে আগুন ধরিয়ে দিতেন, কারো গরু ছেড়ে দিয়ে ধান খাওয়াতেন, দোকানে ঢুকে মিষ্টি খেতেন, অনেককে মারধর করতেন। এসব ঘটনায় তাঁর বড়ভাই একদিন তাঁকে মারধর করে শীতের দিনে ঘরের কোণে খুঁটির সাথে বেঁধে রাখেন। গভীর রাতে বড়ভাই ও ভাবীর ঘুম ভাঙলে দেখতে পান হাফেজ খাজা মহিয়ুদ্দিনের হাতে বাঁধন নেই। তিনি দুই পায়ের উপর ভর দিয়ে হাত মেলে বসে আছেন।
এর আগে জেলার কোম্পানীগঞ্জের চরফকিরাতে মাদ্রাসায় পড়া অবস্থায় কোম্পানীগঞ্জ ও পার্শ্ববর্তী সন্দ্বীপে বিভিন্ন মসজিদে তারাবীর নামাজ পড়াতেন হাফেজ খাজা মহিয়ুদ্দিন। একবার তাঁর সহপাঠী ও শিক্ষকসহ তিনি সন্দ্বীপ থেকে সাম্পানযোগে রওয়ানা হন। এ সময় তিনি অনেকগুলো ডাব সাম্পানে তোলেন। তখন শিক্ষক হাফেজ আবদুল ওহাব তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন মহি তুমি এতো ডাব কেন নিচ্ছো? উত্তরে তিনি বললেন, কাজে লাগবে। নদীপথে হঠাৎ ঝড়-বৃষ্টি শুরু হলে সাম্পানের যাত্রীদের বমি ও ডায়রিয়া শুরু হয়। তাদেরকে তিনি ডাবের পানি খাওয়ালেন। ঝড়ের বেগ আরো বেড়ে গেল, সবাই দোয়া-দুরূদ পড়তে থাকলেন, ঝড় থামলো না। তখন তাঁর শিক্ষক বললেন মহি একটা কিছু করো। তখন তিনি সাম্পানের দুই পাশের বাঁশ বেয়ে দৌড়াদৌড়ি শুরু করেন। আর বলতে থাকেন ‘মহাপ্রভু এবার ক্ষমা করে দাও না’। সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ে সাম্পান ডুবে যায় যায় অবস্থা। তখন আবার শিক্ষক বললেন, আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করো। এবার তিনি নৌকার গুলুইতে নামাজের কায়দায় বসে ফরিয়াদ ও মোনাজাত শেষ করেন। সাথে সাথে থেমে যায় ঝড়। আরেকটি অলৌকিক ঘটনার নিদর্শন হলো কোম্পানীগঞ্জের চরফকিরার বামনী নদীর পাড়ে। নদী তখন বাড়িঘর ভাঙছে। হাফেজ মহিয়ুদ্দিন সাহেব নদী থেকে ঘটিতে করে পানি এনে ছিটিয়ে ফাটল ধরা স্থানে বসে পড়েন। মাদ্রাসার ছাত্ররা চিৎকার শুরু করেন। তখন তাঁর শিক্ষক হাফেজ আবদুল ওহাব তাঁর হাত ধরে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে আসেন। যেখানে তিনি বসেছিলেন পরে সে মাটির খণ্ডটি নদীগর্ভে ভেঙে পড়ে। শেষে নদীভাঙন ঐ স্থান দিয়ে বন্ধ হয়ে যায়।
১৯৭০ সালের নির্বাচনের পূর্বে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নারায়ণগঞ্জের বালুঘাটের এক জনসভায় যাচ্ছিলেন। পথে শ্যামপুরে রাস্তার পাশে একটি ঘরে রং-বেরঙের পতাকা উড়তে দেখে তিনি গাড়ি থামিয়ে নেমে পড়েন। সাথে তার সহযাত্রীরাও থেমে যান। এতো পতাকা কেন? জানতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু জানলেন এখানে পীর হযরত হাফেজ খাজা মহিয়ুদ্দিন (র.)-এর আস্তানা। তিনি অনুমতি চেয়ে পীর সাহেবের সাথে দেখা করতে ঘরে ঢুকলেন। এ সময় পীর সাহেব শুয়ে আছেন। বঙ্গবন্ধু সালাম দিলেন। তিনি লাফ দিয়ে উঠে বসলেন। বঙ্গবন্ধু বললেন, হুজুর আমি ভোটে দাঁড়িয়েছি, আমার জন্য দোয়া করবেন। আমি এখন মিটিংয়ে যাবো। পীর সাহেব বললেন, আমি নৌকায় উঠবো। বঙ্গবন্ধু বললেন, আমি নৌকা পাবো কোথায়? পীর সাহেবের খেদমতকারীরা পাশের নদীতে নৌকা দেখিয়ে দিলেন। পীর সাহেব আগে হেঁটে বঙ্গবন্ধুসহ নৌকায় গিয়ে উঠেন। তিনি ইশারা দিলেন নৌকা সদরঘাটের দিকে যেতে। বঙ্গবন্ধু তার সহযাত্রীদের সেদিকে যাওয়ার নির্দেশ দেন। সদরঘাট হয়ে নৌকা আবার সে স্থানে ফিরে আসে। বঙ্গবন্ধু ফিরে যাবারকালে পীর সাহেব বললেন, খোদার কাছ থেকে গদি এনে আপনাকে বসিয়েছি, আপনি জনগণের দিকে খেয়াল রাখবেন। যেদিন ’৭০-এর নির্বাচন, সেদিন পীর সাহেব সারাদিন নদীতে নৌকাতে বসেছিলেন। সন্ধ্যায় খুশিতে নৌকা থেকে নামলেন। খেদমতকারীরা তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেনÑ শেখ মুজিব কি প্রেসিডেন্ট হয়েছেন! তিনি বললেন, হয়েছে তো। বঙ্গবন্ধু হত্যার পূর্বে পীর সাহেব হত্যার ঘটনা ঘটবে বলে আকারে ইঙ্গিতে বলে গিয়েছেন। পীর সাহেবের এ আস্তানায় শুধু বঙ্গবন্ধু নয়, আবদুল মালেক উকিল, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, চৌমুহনীর নুরুল হক মিয়াসহ আওয়ামী লীগের অনেক প্রভাবশালী নেতা তাঁর দরবারে দোয়ার জন্য হাজির হতেন।
১৯৬৯-এর গণআন্দোলনের সময় পল্টনের প্রথম মিটিংয়ের দিনের ঘটনা। হঠাৎ পীর সাহেব তাঁর খেদমতকারীদের বললেন, রাস্তা পরিষ্কার করেন। কিছুক্ষণ পর দেখা গেল আদমজী জুট মিলের শ্রমিক নেতা ছায়েদুল হক ছাদু দরবারে এসে হাজির হয়ে হুজুরকে সালাম করলেন। হুজুর বললেন, উনি আমাদের আদমজী শহরের সরকার। এর আগে ছাদু শ্রমিকের চাকরি করতেন। পরে তিনি আমদজী জুট মিলের একচ্ছত্র নেতা এবং বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত স্নেহভাজন ছিলেন।
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ কালরাতের পরদিন নারায়ণগঞ্জের বালুঘাটে হযরত হাফেজ খাজা মহিয়ুদ্দিন (র.) প্রথম উরসের আয়োজন করেন। ২৬ মার্চ রাতে বিশ হাজার লোকের খাবার আয়োজন চলছিল। পরদিন সকালে চারদিকে গোলাগুলির শব্দ। আগত হাজার হাজার ভক্তরা দ্রুত স্থান ত্যাগ করেন। খাবারসামগ্রী মাঠে পড়ে থাকে। সকাল ১১টার দিকে পাকিস্তানী সেনারা মাঠে এসে হাজির। তখন তাঁর খেদমতকারীরা হুজুরকে বললেন, ‘হুজুর আমাদেরকে মেরে ফেলবে।’ তিনি বললেন, ‘আমাদের কোনো ছেলের গায়ে গুলি লাগবে না।’ একপর্যায়ে পাকসেনারা হুজুরের ছয় খেদমতকারীকে ধরে নিয়ে মাঠে দাঁড় করিয়ে স্টেনগানের গুলি চালাতে চেষ্টা করে। কিন্তু গুলি বের হচ্ছে না। যে পাকসেনা স্টেনগান দিয়ে গুলি করছে সে ঘামাচ্ছে। এ সময় এক সেনা কর্মকর্তা এসে সে সৈন্যের পাছায় লাথি মেরে বলেছে, ‘বেটা দেখছো না এটা দরবার শরীফ।’ এ দরবার শরীফের আস্তানার সামনে ও ডেগের উপর বাংলা, ইংরেজি, উর্দুতে লেখা ছিলÑ হযরত হাফেজ খাজা মহিয়ুদ্দিন (র.)-এর নাম। পরে সে সেনা কর্মকর্তা পীর সাহেবের কাছে এসে ক্ষমা ও দোয়া চেয়ে চলে যায়। এসব অলৌকিক ঘটনা ছাড়াও তাঁর জীবদ্দশায় হাজারো অলৌকিক ঘটনা তাঁর ভক্তদের মুখে মুখে ফিরে।
এ আধ্যাত্মিক পীরেকামেল হযরত হাফেজ খাজা মহিয়ুদ্দিন (র.) একলাশপুরী নামে সর্বজন পরিচিত। তাঁর পিতা হাফেজ হায়দার উদ্দিন কাজী ও মাতা হাফেজ বদরুন্নেছা। তাঁর পিতামহ ও পিতা দুইজনই ছিলেন হাফেজ ও বুজুর্গান ব্যক্তি। তিনি ১৮৮৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন ও ১৯৭৬ সালে ১৩ এপ্রিল ৮৮ বছর বয়সে পরলোক গমন করেন। এ পীর সাহেবকে সমাহিত করা হয় বেগমগঞ্জের একলাশপুর গ্রামে। হযরত হাফেজ খাজা মহিয়ুদ্দিন (র.)-এর জীবদ্দশায় তিনি বিভিন্ন জেলায় তাঁর দরবার শরীফ ও আস্তানা গড়ে তোলেন। তার মধ্যে চাঁনমারী নারায়ণগঞ্জ, শ্যামপুর বাজার ঢাকা, ঢাকা ম্যাচ ফ্যাক্টরী ময়দান, আদমজী হাইস্কুল প্রাঙ্গণ ও চৌমুহনী রেলওয়ে ময়দান। একলাশপুরে তাঁর রওজা শরীফে ৩০ চৈত্র থেকে ৩ দিনব্যাপী উরস ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এ অনুষ্ঠানে হাজারো ভক্তগণ ছাড়াও অন্য ধর্মাবলম্বীরাও সমবেত হয়। এছাড়াও প্রতিদিন এ রওজা শরীফে অনেক ভক্ত জিয়ারত করতে আসেন। এ তথ্য পীর সাহেবের জীবন কাহিনী এক থেকে সংগৃহীত।

শেয়ার করুনঃ

98 thoughts on “নোয়াখালীর আধ্যাত্মিক পীর হযরত হাফেজ খাজা মহিয়ুদ্দিন (র.)”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

  • আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

    রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি
     
    ১০১১
    ১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
    ১৯২০২১২২২৩২৪২৫
    ২৬২৭২৮২৯৩০৩১